৫ই এপ্রিল। ১৯৮৩ সাল। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয় “কবরেও ধনী দরিদ্র” শিরোনামে মর্মস্পর্শী একটি সত্য ঘটনা। এই ঘটনা সেদিন অনেকের চোখেই পানি এনে দিয়েছিল। ক্ষত-বিক্ষত করেছিল প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে। তারা ভেবেছিল, বর্তমান এই সভ্য জগতেও কি এমন কঠিন হৃদয়ের মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের ইজ্জত সম্মান ও আভিজাত্যকে রক্ষা করার হীন স্বার্থে আপন ফুফুর সাথে শুধু ‘গরীব’ হওয়ার অপরাধে এমন নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরণ করতে পারে? তাও আবার জীবদ্দশায় নয়, মৃত্যুর পরে!
কিশোরগঞ্জ জেলার অধিবাসী ওয়াজেদুল ইসলাম খাঁ। অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। বর্তমানে গ্রামের নিবাস ছেড়ে ঢাকা শহরে এসে বসবাস করছেন। ‘আসুর মা’ বলে পরিচিত তার এক গরীব ফুফু ছিল। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে এই আসুর মা দুনিয়া থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন। ফুফুর ইন্তেকালের সময় খাঁ সাহেব ছিলেন ঢাকায়। মৃত্যু সংবাদ তিনি সাথে সাথে পেয়েছিলেন কি-না তা জানা যায়নি। ফুফুর সামাজিক অবস্থান আর খাঁ সাহেবের সামাজিক অবস্থান ধন-দৌলতের মানদন্ডে আসমান-জমীন ব্যবধান থাকার কারণে হয়তো সামাজিক সম্পর্কও ছিল দুই দিগন্তে। এজন্য কেউ বোধ হয় তাকে মৃত্যু সংবাদ পৌঁছাবার সাহসও করেনি। অথবা মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে থাকলেও গরীবের জানাযায় শরীক হওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলেও তিনি হয়তো মনে করেননি। যে কোন কারণেই হোক ফুফুর মৃত্যুর সময় বা তার দাফনের পর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও খাঁ সাহেব গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে জানতে চেষ্টা করেননি যে, কি অসুখে কিভাবে তার ফুফু মারা গেলেন। মৃত্যুর প্রায় একমাস পর তিনি জানতে পারলেন যে, তার পারিবারিক কবরস্থানে ফুফুকে সমাহিত করা হয়েছে।
সংবাদ শুনে তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তার ক্ষুদ্ধ চেহারা যেন বলছিল, গ্রামের লোকজন তার ফুফুর লাশকে তারই পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে শুধু মস্তবড় ভুলই করেনি, মহা অন্যায়ও করেছে। এতে তার চরম অপমান হয়েছে। কেমন করে এ অপমান সহ্য করা যায়!
ধনী খাঁ সাহেবের ধন দৌলত এতদিনে তাকে সমাজের মধ্যে একটা সম্মানের আসন সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই সম্মান তাকে গরীব আত্মীয় স্বজন থেকে আলাদা করে রেখেছে। তাইতো এখন তার চাল-চলন, বেশ-ভূষা, উঠা-বসা সবই আলাদা। এমনকি পরিচিতিও আলাদা। নতুন নতুন আত্মীয়তার ক্ষেত্রও গড়ে উঠেছে আলাদাভাবে। শুধু তাই নয় সামাজিক স্টেটাস রক্ষা করার খাতিরে তিনি গোরস্থানও আলাদা করে নিয়েছেন। অতএব এমন মর্যাদাবান ব্যক্তির পারিবারিক গোরস্থানে গরীব ফুফুর মৃত দেহটাকে স্থান তো দেয়া যায় না!
খাঁ সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন, যে কোন উপায়েই হউক গরীব ফুফুর লাশকে তার পারিবারিক গোরস্থান থেকে উত্তোলন করতেই হবে। কিছুতেই উহাকে সেখানে রাখা যাবে না। কারণ এতে তার মান যাবে। ইজ্জত, সম্মান, সুনাম সবই ভুলষ্ঠিত হবে।
এ সিদ্ধান্ত তিনি রাজধানী ঢাকাতেই বসেই নিয়েছেন। হোক না এই মহিলা তার ফুফু, তাতে কি হয়েছে? গরীবকে তো আর ধনীদের সাথে মিলানো যায় না। গরীব-ধনীর পার্থক্য তো কবরেও থাকা চাই।
খাঁ সাহেব ঢাকা থেকে দুজন ডোম নিয়ে গ্রামে আসেন। অতঃপর তাদেরকে দিয়ে ফুফুর গলিত লাশটি কবর থেকে তুলে অন্যত্র মাটি চাপা দেন। গ্রামবাসীরা এ দৃশ্য দেখে যারপরনাই বিস্মিত হয়। কেউ কেউ সাহস করে আপত্তি জানায়। কিন্তু খাঁ সাহেব কারো কথায় কর্ণপাত করেননি। কারণ ব্যাপারটি তার মর্যাদার সাথে সম্পর্কযুক্ত। গরীব ফুফুর গলিত লাশ অন্যত্র সরিয়ে নেবার কারণে খাঁ সাহেবের পারিবারিক গোরস্থানের মান-মর্যাদা যেন আবার ফিরে আসে। খাঁ সাহেব প্রমান করে ছাড়লেন যে, জীবিত অবস্থায় সামাজিক প্রেষ্টিজ আর স্টেটাসের যেমন সিড়ি থাকে, আশরাফ-আতরাফের পার্থক্য মেনে চলা হয়, ধনী-গরীবের ব্যবধান থাকে, মুত্যুর পর কবরেও সেই ব্যবধান অবশিষ্ট থাকে, ধনী গরীবের ব্যবধান লোপ পায় না।
খাঁ সাহেবের বাপের আদরের বোন আসুর মা শুধু গরীব হওয়াটাই যেন তার সব চেয়ে বড় অপরাধ। যার কারণে খাঁ সাহেবের পারিবারিক গোরস্থানে মরণের পরেও তিনি ঠাই পেলেন না। খাঁ সাহেবের মত মানুষদের গরীব ফুফুরা এ আচরণই জীবিত থাকতে এবং মরণের পরে পেয়ে থাকেন। যেমন পেয়েছেন আসুর মা নামের গরীব ফুফু। এরই নাম খাঁ সাহেবদের প্রেস্টিজ রক্ষা, যে প্রেস্টিজের উপর শুধু মানুষই নয় শয়তানও বোধ হয় থুথু নিক্ষেপ করে। রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করে খাঁ সাহেবরা স্টেটাস রক্ষার জন্য মিথ্যা আভিজাত্যের যে মেকী আবরণ সৃষ্টি করে রাখেন পরকালেও কি তারা এই স্টেটাস রক্ষা করতে পারবেন? দুর্বলদের দাবিয়ে রাখার নীতি পালনই যাদের দুনিয়ার সাধনা- তারা আখেরাতে হাই স্টেটাসতো পাবেই না, বরং কঠিন থেকে কঠিনতর আযাবই তাদের জন্য বরাদ্ধ হবে। এটাই আল্লাহর বিধান।
–যে গল্পে হৃদয় গলে ৩

0 Comments