Looking For Anything Specific?

ads header

অপূর্ব আত্মদান – যে গল্পে হৃদয় গলে ২ |

Apurbo Atmadan


দর যুদ্ধের চরম পরাজয়ের পর মক্কা নগরীতে সেই যে শোকের ছায়া নেমেছে আজো তা মুছেনি। কাফির মুশরিকরা আজও ভুলতে পারেনি, তাদের সেই পরাজয়ের গ্লানি। মনে হয় এ পরাজয় যেন তাদের জীবন থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছে সকল হাসি আর আনন্দ-উল্লাস। বিষাদময় মক্কার আকাশে বাতাসে এখন আর আগের চঞ্চলতা নেই। নেই মরুচারী যাযাবরদের দুরন্তপনা।

      কিন্তু একটি ঘোষণা হঠাৎ করেই মক্কার সর্বত্র নতুন করে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। চতুর্দিকে বয়ে চলল হর্ষ-উল্লাসের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার। এইতো কিছুক্ষণ পূর্বে দফ বাজিয়ে ঘোষণা করা হল, মুহাম্মদের ঐ চরটিকে আজ শূলে চড়ানো হবে, বদর যুদ্ধে যে হারিছ বিন আমেরকে হত্যা করেছিল। ঘোষণা শুনে সকলেই দৃশ্যটি উপভোগ করার জন্য ছুটে চলল।

তানঈনের বিশাল প্রান্তর। শিশু -কিশোর থেকে শুরু করে মক্কার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই সেখানে সমবেত হয়েছে। প্রতি হিংসার পাশবিক আনন্দ সকলের চোখে মুখেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জনতার ভীড়ের মাঝে সকল প্রকার কটাক্ষ ও হৈ-হুল্লোর উপেক্ষা করে বন্দী খুবাইব (রাঃ) নিশ্চিন্তে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছেন। যেন ভাবনার এক নতুন জগতে হারিয়ে গেছেন তিনি। তার সামনেই স্থাপিত হল শূল-কাষ্ঠ। একটু পরেই তার জীবন প্রদীপ চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে। অথচ কি আশ্চর্য! তার চেহারায় কোন ভয়ের ছাপ নেই, নেই হীম-শীতল মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকার আতংকে কোন বিষন্নতা। কিংবা বিচলিত হওয়ার ক্ষীণতম লক্ষণ। জীবন-মুত্যুর এই সন্ধিক্ষণে এক মুশরিক বীর ধীর পদে এগিয়ে এসে হযরত খুবাইব (রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলল, ‘হে পিতৃ পুরুষের ধর্ম ত্যাগকারী! তোমার জীবন লীলা এখনই সাঙ্গ হবে। চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে তোমার হৃদয়স্পন্দন। এই অন্তিম মুহূর্তে তোমার কোন বাসনা আছে কি?’

খুবাইব (রাঃ) মুখ তুলে প্রশ্নকারীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ! দুনিয়া থেকে বিদায়ের এবং আপন প্রভুর সাথে মিলিত হওয়ার সময় সন্নিকটে। কাজেই আমাকে দু’রাকাত নামায পড়ার সুযোগ দাও।’

কাফির মুশরিকদের নিশ্চিদ্র বেষ্টনীর মাঝে অন্তিম আকাঙ্খা পূরণের জন্য খুবাইব (রাঃ) নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। খোদা প্রেমের কি অপূর্ব দৃশ্য! যেন স্বীয় সত্তাকে হারিয়ে বহুদূরে কোথাও চলে গেছেন। যেন গোপন অভিসারে প্রেমাস্পদের কানে কানে প্রেমকথা বলছেন। জীবনের সঞ্চিত সব প্রেম-ভালবাসা, ভক্তি শ্রদ্ধা প্রভুর সমীপে উজাড় করে দিচ্ছেন সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।

খুবাইব (রাঃ) শান্তভাবে নামায শেষ করে বললেন, ‘তোমরা হয়তো মনে করছো, মৃত্যুর ভয়ে আমি নামায বিলম্ব করছি; নচেৎ আরও দু’রাকাত নামায পড়তাম।’

জীবনের অন্তিম মুহূর্তে রবের ইবাদতে এত গভীর ভাবে মগ্ন হওয়া যায়, শেষ আকাঙ্খা হিসেবে ইবাদতকে বেছে নেয়া যায়; হাতে গড়া নিস্প্রাণ মূর্তি পূজারী বেওকুফ কাফেররা কোন দিন তা ভাবতেও পারেনি। তাইতো তখন বেশ কিছু চাপা প্রশ্ন তাদের হৃদয়-মনকে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। বিবেকের দংশন তাদের ভিতরটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছিল। তাদের বিবেক বলছিল-তারা কি এমন নিষ্ঠার সাথে প্রভুর ইবাদত করতে পেরেছে? পেরেছে কি তাদের প্রতিমার সামনে এমন কায়মনোবাক্যে দাঁড়াতে? অন্তিম আকাংখা পূরণের সুযোগ পেলে তারা কি প্রতিমার পূজাকে পছন্দ করবে? বিবেকের এই প্রশ্ন বানে জর্জরিত হয়ে      একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছিল তারা।

নামায শেষে তাকে শূলিতে চড়ানো হল। ৪০জনের এক সারিবদ্ধ তীরন্দাজ দল চতুর্দিক দিক থেকে তাঁর উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। আঘাতের পর আঘাত খেয়ে তার সমস্ত দেহ চালনীর মত হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু কি আশ্চর্য! আল্লাহর প্রেমে নিবেদিত প্রাণ খুবাইব (রাঃ) অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত। রূপ কথার মত শুনালেও বাস্তব সত্য যে, ‘উহ’ শব্দটি পর্যন্ত তার মুখ থেকে বের হল না। নশ্বর দেহের সাথে কি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক আচরণ চলছে সে দিকে নয় বরং আরও উর্ধ্বে অদৃশ্যলোকে তার দৃষ্টি। তার দৃষ্টি তখন সুদূর নীল আকাশের নীলিমায় নিবদ্ধ। দৃঢ় প্রশান্তিতে তার মুখ-মণ্ডল দীপ্তিমান। হয়তো সেখান থেকে বেহেশতের ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট হুরের দল তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। না হয় জান্নাতের অবিনশ্বর নয়নাভিরাম সবুজ বাগ-বাগিচার দৃশ্যে আটকে রয়েছে তাঁর পলকহীন দৃষ্টি।

ইতিমধ্যে এক কাফের তাকে লক্ষ্য করে কসম খেয়ে বলল, ‘খুবাইব! তুমি চাইলে এখনও পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যেতে পার। তবে শর্ত হল- একথা তোমাকে স্বীকার করতে হবে যে, তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কতল করা হবে এতে তুমি সন্তুষ্ট।’

একথা শুনে হঠাৎ করেই যেন জ্বলে উঠল মৃত্যু পথযাত্রী খুবাইব (রাঃ) এর চোখের তারা। ঘৃণা আর ক্রোধে কাঁপতে শুরু করল তার সমস্ত দেহ। তার নেতিয়ে পড়া শির আঘাত খাওয়া ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের ন্যায় ফুসে উঠল। অতঃপর অগ্নিঝরা কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হল, ‘আমার প্রাণের বিনিময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ে একটি কাঁটাও বিদ্ধ হোক তাও আমি সহ্য করব না।’

জবাব শুনে সকলেই হতবাক। অবাক বিস্ময়ে খুবাইব (রাঃ) এর দিকে তাকিয়ে তারা ভাবে, এমন কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়েও কি কেউ প্রেমাস্পদের বিপদাশংকায় শিউরে উঠতে পারে? পারে নিজের মৃত্যু যাতনাকে এত সহজে ভুলে যেতে? তবে কি সত্যিই তারা রাসূলের পদতলে আপন জীবন লুটিয়ে দিতে প্রস্তুত?

একদিকে কাফিরদের সারিবদ্ধ প্রচণ্ড আক্রমণ আর অন্যদিকে রাসূল প্রেমে আত্মহারা খুবাইব (রাঃ) কাতর স্বরে প্রার্থনা করছেন- ‘হে খোদা! এমন কেউ আছে কি? যিনি তোমার রাসূলের নিকট আমার বিদায় বেলার সালাম খানি পৌঁছে দেবে?’ আল্লাহ পাক তখন অহীর সাহায্যে তার অন্তিম সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছিয়ে দিলেন। সালাম পেয়ে মদীনায় বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে উঠলেন- ‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম ইয়া খুবাইব!’ অতঃপর তিনি সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘কোরেশরা খুবাইবকে শহীদ করে দিয়েছে।’

এ ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহাবায়ে কেরামের প্রেম ও ভালবাসার চরম নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রিয়তম নবীকে কষ্ট দেয়া তো দূরের কথা, তার পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হউক একথা মুখে উচ্চারণ করাও তাদের সহ্য হতো না।

প্রিয় পাঠক? আমরাও পারি না সাহাবাদের মতো রাসুলের প্রতি ভালবাসার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে? আমাদের একথা ভাল করে জেনে রাখা দরকার যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসা ছাড়া আল্লাহকে ভালবাসা সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাসতে চাও তাহলে আমি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুসরণ অনুকরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ সমূহকে মাফ করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মহাক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।”

এক হাদীসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পিতা-পুত্র ও দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয় পাত্র না হই"।

শেষ তীরটি মুমুর্ষ খুবাইবের শরীরে বিদ্ধ হলো। পুনরায় নেতিয়ে পড়লো তাঁর উন্নত শির। নশ্বর মাটির দেহ থেকে বেরিয়ে গেলো তার অবিনশ্বর আত্মা। আর তার প্রশান্ত মুখের সেই অনাবিল হাসি ফুটে আছে অনন্তকালের দৃশ্যহীন অবয়বে। এ হাসি মুখ মলীন হবে না কোন দিন।

 ধারাবাহিক - যে গল্পে হৃদয় গলে

Post a Comment

0 Comments